অবশেষে এসএমপিতে ইডটকো, লাগাম টানতে বিধিনিষেধ

[ad_1]

আল-আমীন দেওয়ান : অবশেষে লাগাম পরানো হলো টাওয়ার শেয়ারিং কোম্পানি ইডটকোর। কোম্পানিটিকে ‘এসএমপি’করা হয়েছে, দেয়া হয়েছে বিধিনিষেধ।

এতে ইডটকোর নতুন টাওয়ার নির্মাণ, টাওয়ার কেনার মতো কার্যক্রম সীমিতকরণ হচ্ছে।   

সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার বা এসএমপি দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে মনোপলি ব্যবসা ঠেকানোর রেগুলেশন। খাতটিতে অসম প্রতিযোগিতা ঠেকিয়ে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ রাখা এবং সেবার গুণগত মান নিশ্চিতে এই এসএমপি।   

Techshohor Youtube

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ইডটকোকে এসএমপি করার প্রক্রিয়া চলছিলো। আর  বাংলাদেশে এই টাওয়ার কোম্পানিটির এসএমপি হওয়া ঠেকাতে মালয়েশিয়ান হাইকমিশন, মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়সহ নানা পর্যায়ের লবিং-কূটনৈতিক তৎপরতা চলতে থাকে।

তবে এসব সামলে শেষ পর্যন্ত বিটিআরসি ইডটকোকে এসএমপি করে বেশ কিছু বিধিনিষেধ দিয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার টেকশহর ডটকমকে বলেন, ‘আমরা জোর করে কিছু চাপিয়ে দেই না, যেটা যুক্তিসঙ্গত সেটিই করা হয়। ইডটকোকে এসএমপি করা হয়েছে বাজারে মনোপলি ঠেকানো এবং সাম্যবস্থা রাখতে।’

বিটিআরসির ভাইস-চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র টেকশহর ডটকমকে বলেন, বাজারে একটা মনোপলি হয়ে আছে । এই মনোপলি ভেঙ্গে দিয়ে বাজারে যেনো সাম্যবস্থা ফিরে আসে সেই লক্ষ্যেই ইডটকোকে এসএমপি করা হয়েছে। ইডটকোতো একচেটিয়া হয়ে আছে। তাই কারও যেনো ক্ষতি না হয়, বাজারে আরও তো সবাই ব্যবসা করছে।

এসএমপি করলেই যে তাদের ব্যবসায় ক্ষতি হবে এমন না, তাদের ব্যবসায় যেন ক্ষতি না হয় সেটাও গুরুত্বসহকারে দেখা হয়েছে।

এসএমপি কোম্পানি হওয়ার পর ইডটকোর কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চায় টেকশহর। ইডটকোর কর্পোরেট কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট আমিনা মুন্নী টেকশহর ডটকমকে জানান, ‘ইডটকোর পক্ষ হতে এখন কোনো মন্তব্য নেই।’

যেসব বিধিনিষেধ আরোপ :

একটি প্রান্তিকে (প্রতি তিন মাসে) সব মোবাইল ফোন অপারেটরের নতুন টাওয়ার স্থাপনের মোট চাহিদার সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ টাওয়ার নির্মাণ করতে পারবে ইডটকো। অর্থাৎ এক প্রান্তিকে যদি সবগুলো অপারেটর মিলে ১০০ টি টাওয়ার নির্মাণের প্রয়োজন হয় তাহলে ইডটকো সেখান হতে ২৫টি নির্মাণ করতে পারবে আর বাকি ৭৫ টি অন্য তিন টাওয়ার কোম্পানি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজেরা নির্মাণ করবে।

সব মোবাইল ফোন অপারেটর একটি প্রান্তিকে তাদের বিক্রি,লিজ বা রোলব্যাকের সব টাওয়ারের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ইডটকোর কাছে দিতে পারবে। বাকি ৭৫ শতাংশ থাকবে তিন টাওয়ার কোম্পানির জন্য। ওই তিন টাওয়ার কোম্পানি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যে যতো টাওয়ার নিতে পারে।

এই দুই বিধিনিষেধের বিষয়ে বলা হয়েছে, কোনো প্রান্তিকে সব মোবাইল ফোন অপারেটরের নতুন টাওয়ার নির্মাণ, বিক্রি, লিজ বা রোলব্যাকের জন্য পরিকল্পিত টাওয়ার সংখ্যা এবং ওই প্রান্তিক শেষে এসব ক্যাটাগরিতে বাস্তবায়িত টাওয়ারের সংখ্যার ভিত্তিতে পরবর্তী প্রান্তিকে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের পরিকল্পিত টাওয়ার সংখ্যার সমন্বয় হবে।

আরোপিত বিধিনিষেধগুলো ছাড়াও আরও বিধিনিষেধ প্রয়োজনে আরোপ করা হতে পারে। যেখানে রয়েছে,রেভিউনিউ শেয়ারিং, মার্কেট কমিউনিকেশন, লক ইন পিরিয়ড, এক্সক্লুসিভিটি, সার্ভিস অ্যাপ্লিকেশন প্রসেস ও এনওসি, সিএসআর, সিআর,সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ড, গ্রিন টেকনোলজি, রিনিউয়েবল এনার্জিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র ।

ইডটকোর মনোপলি :

দেশের টাওয়ার কোম্পানিগুলোর মোট টাওয়ার সংখ্যা হলো ১৬ হাজার ২৬৩টি।

সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইডটকোর টাওয়ার সংখ্যা ১৪ হাজার ১২১টি। এরমধ্যে পূর্ণ টাওয়ার ১৩ হাজার ৬০৯ টি, কাজ চলমান ৭৮ টি এবং কার্যাদেশ আছে কিন্তু কাজ শুরু হয়নি এমন ৪৩৪ টি টাওয়ার।

সামিটের টাওয়ার রয়েছে ১ হাজার ৩৩৬টি। এরমধ্যে পূর্ণ টাওয়ার ১ হাজার ৩ টি, কাজ চলমান ২৫৭ টি এবং কার্যাদেশ আছে কিন্তু কাজ শুরু হয়নি এমন ৭৬ টি টাওয়ার।

কীর্তনখোলার আছে ৪১২ টি। এরমধ্যে পূর্ণ টাওয়ার ৩১৪ টি, কাজ চলমান ৭৭ টি এবং কার্যাদেশ আছে কিন্তু কাজ শুরু হয়নি এমন ২১ টি টাওয়ার।

এবিহাইটেকের টাওয়ার সংখ্যা ৩৯৪টি। এরমধ্যে পূর্ণ টাওয়ার ২১০ টি, কাজ চলমান ১৮৪ টি  টাওয়ারের।

হিসাব বলছে, মোট টাওয়ার সংখ্যার ৮৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ দখলে ইডটকোর, ৮ দশমিক ২১ শতাংশ দখলে সামিটের, ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ দখলে কীর্তনখোলার এবং ২ দশমিক ৪২ শতাংশ দখলে এবিহাইটেকের।

এবার দেখা যাক, রাজস্ব আয়ের মানদণ্ডে কে কোথায়?

২০১৮ সালের নভেম্বর হতে ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত এই সময়ে ইডটকো আয় করেছে ৪ হাজার ১৩ কোটি ৫৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।

সামিট আয় করেছে ৫০ কোটি ৯ লাখ ৫৩ হাজার টাকা, কীর্তনখোলা ৮ কোটি ৩৯ লাখ ১৪ হাজার এবং এবিহাইটেক ১৩ কোটি ২৪ লাখ ৮ হাজার টাকা।

দেখা যাচ্ছে, রাজস্ব আয়ে ইডটকোর বাজার দখল ৯৮ দশমিক ২৪ শতাংশ, সমিটের ১ দশমিক  ২৩ শতাংশ, কীর্তনখোলার ০ দশমিক ২১ শতাংশ এবং এবি হাইটেকের ০ দশমিক ৩২ শতাংশ।

পরিসংখ্যান বলছে, টাওয়ার কিংবা রাজস্ব উভয় দিকেই বাজারে ইডটকো অস্বাভাবিক মনোপলি করছে।  

ইডটকো যেভাবে এসএমপি প্রক্রিয়ায় :

দেশে টাওয়ার ব্যবসায় ইডটকো ছাড়াও রয়েছে সামিট টাওয়ার, কীর্তনখোলা টাওয়ার এবং এবি হাইটেক কনসোর্টিয়াম।

২০২১ সালের ১৯ জুলাই বিটিআরসির ভাইস-চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্রকে আহবায়ক করে টাওয়ার শেয়ার কোম্পানিগুলোর এসএমপি নির্ধারণে ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।

এরআগে সামিট, কীর্তনখোলা এবং এবিহাইটেক একসঙ্গে বিটিআরসিকে চিঠি দিয়ে জানায়, ইডটকোর কারণে বাজার অস্থিতিশীল এবং প্রতিযোগিতা নষ্ট হচ্ছে।

কোম্পানিগুলো ওই চিঠিতে ইডটকোর বাজার শেয়ার এবং একটি মোবাইল ফোন অপারেটরের অঙ্গসংগঠন হিসেবে অধিপত্য বিস্তারের বিষয়ে উল্লেখ করে। তারা বলছে, ইডটকো অস্বাভাবিক কম দামে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোকে বিভিন্ন প্যাকেজ দিয়ে আগ্রাসী ভূমিকা নিচ্ছে।

বিটিআরসির কমিটি পরে টাওয়ার শেয়ার কোম্পানির এসএমপির নির্ণায়ক ঠিক করে। যেখানে কোম্পানির টাওয়ার সংখ্যা, অর্জিত বার্ষিক রাজস্ব এবং ৪০ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।

এবার কয়েক দফায় দেশের টাওয়ার কোম্পানিগুলোর টাওয়ার, রাজস্ব, বিটিআরসির সঙ্গে রাজস্ব শেয়ার, বাজার দখলসহ ইত্যাদি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কমিটি।

টাওয়ার কোম্পানিসহ খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে অনেক সভা করে বিটিআরসি, চলে যাচাই-বাছাই।  অবেশেষে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে একাধিক আলোচানা-বৈঠকের পর ইডটকোকে এসএমপি করার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।  

কী প্রভাব এসএমপির পর ?

দেশে সবগুলো মোবাইল ফোন অপারেটরের মোট নিজস্ব টাওয়ার রয়েছে ২২ হাজার ২৬৪টি। যেখানে অপারেটরগুলো দাতা হিসেবে ৪ হাজার ১০২ টি টাওয়ার শেয়ার করেছেন।

এরমধ্যে গ্রামীণফোনের নিজস্ব টাওয়ার ১০ হাজার ২৯৮ টি, শেয়ার করা টাওয়ার ২ হাজার ২৮১ টি। রবির ২ হাজার ৪৬৬ টি নিজস্ব আর শেয়ার করা টাওয়ার ৭৩১টি। বাংলালিংকের নিজস্ব টাওয়ার ৬ হাজার ১৩৮ টি, শেয়ার করা ১ হাজার ৯০ টি এবং টেলিটকের নিজস্ব টাওয়ার ৩ হাজার ৩৬২ টি, কোনো শেয়ার নেই।

দেখা যাচ্ছে, নিজস্ব টাওয়ারের মধ্যে দাতা হিসেবে শেয়ার করা টাওয়ারের পরিমাণ গ্রামীণফোনের ২২ দশমিক ১৫ শতাংশ, রবির ২৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ, বাংলালিংক ১৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ এব টেলিটক শূণ্য শতাংশে রয়েছে।

আর মোট টাওয়ারের হিসেবে ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ লিজ বা শেয়ার করা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যানে টাওয়ার কোম্পানিগুলোর জন্য এসএমপির পর দুটি পর্যালোচনা করেছে বিটিআরসি।

এক. যদি মোবাইল অপারেটরগুলোর ৫০ শতাংশ নিজস্ব টাওয়ার টাওয়ার কোম্পানিগুলোকে লিজ বা বিক্রি করা হয় এবং সবাই ২৫ শতাংশ করে পেলে।

দুই. যদি মোবাইল অপারেটরগুলোর বাকি ৫০ শতাংশ নিজস্ব টাওয়ার টাওয়ার কোম্পানিগুলোকে লিজ বা বিক্রি করা হয় এবং সবাই ২৫ শতাংশ করে পায়।

এই পর্যালোচনায় দেখা যায় দুই ভাগে মোট টাওয়ার সংখ্যার ১০০ শতাংশই লিজ বা বিক্রি করলে এসএমপি অপারেটর হিসেবে ইডটকোর বাজার শেয়ার দাঁড়ায় ৫১ দশমিক ১০ শতাংশ।

আর এসএমপি নয় এমন অপারেটর সামিট ১৭ দশমিক ৯১ শতাংশ, কীর্তনখোলা ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং এবিহাইটেক ১৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ বাজার শেয়ার পায়।    

এছাড়া, মোবাইল ফোন অপারেটররা বলছে, টাওয়ার কোম্পানিগুলো এখন আরও গতিশীল হলে এ খাতে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং তাদের যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ বাড়বে।

আগে যা ঘটেছিলো :

ইডটকোকে এসএমপি করার উদ্যোগ-প্রক্রিয়া, মালয়েশিয়া সরকারের লবিং-কূটনৈতিক তৎপরতার বিস্তারিত ইতোপূর্বে করা টেকশহরের দুটি বিশেষ প্রতিবেদনে রয়েছে।

এসএমপি ঠেকানোর কূটনৈতিক তৎপরতায় ‘সফল’ ইডটকো, আবেদন বিবেচনার আশ্বাস

ইডটকোর এসএমপি ঠেকাতে মালয়েশিয়া সরকারের জোর লবিং

টেলিযোগাযোগ খাতের প্রথম এসএমপি কোম্পানি হলো গ্রামীণফোন। আর দ্বিতীয় কোম্পানি হিসেবে এসএমপিতে পড়লো ইডটকো ।



[ad_2]

Source link

Leave a Comment