মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে বিজ্ঞপ্তি: অপূর্বদের অভিবাদন

[ad_1]

মায়ের জন্য পাত্র খুঁজতে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন ছেলেরা। গত সোমবার প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তা ‘ভাইরাল’ হয়। পাঠক হিসেবে খবরটি পড়তে গিয়ে কাছ থেকে দেখা একটা ঘটনার কথা মনে পড়ল।

যাঁকে নিয়ে ঘটনা, তিনি আমার পরিবারেরই অংশ। তিনি আমার গৃহকাজের সহকারী। বয়স ৪৫-এর কোঠায়। বছরখানেক আগের কথা। একদিন আমার সহকারী এসে বললেন, গ্রাম থেকে তাঁর জন্য বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। পাত্রের স্ত্রী মারা গেছেন। ছেলেমেয়ে, নাতিনাতনি আছে। তিনি একজন সঙ্গী চান।

সহকারীর ব্যক্তিগত অনেক বিষয় আমার জানা ছিল। তাই আমি বললাম, ‘আপনি রাজি হয়ে যান।’

আমার কথা শোনার পর সহকারীর চোখমুখে একটা ইতস্ততভাব দেখা গেল। বুঝলাম, তিনি একধরনের সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। আমার কথার জবাবে তিনি একটু মুখে টেনে বললেন, ‘না, আর বিয়ের শখ নাই।’

সহকারীর আর ‘বিয়ের শখ’ না থাকার পেছনে একটা কারণ আছে। কারণটি তাঁর সাবেক স্বামীর সংসারের তিক্ত অভিজ্ঞতা। তিনি ছিলেন ওই ব্যক্তির প্রথম স্ত্রী।

সাবেক স্বামীর বাড়ি সীমান্ত এলাকায়। কাচা পয়সা হাতে আসায় তিনি আরও দুটি বিয়ে করেন। কলহের জের ধরে তাঁকে (সহকারী) একদিন বাড়ি থেকে বের করে দেন স্বামী। পরে তিনি বিয়েবিচ্ছেদ ঘটান।

সহকারীর দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় দুই ছেলে-মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে। তার পড়ার খরচ সহকারীকেই চালাতে হয়। কারণ, সাবেক স্বামী দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহী। এ অবস্থায় গ্রাম থেকে শহরে কাজ করতে আসেন তিনি।

কয়েক দিন পর বিয়ের প্রস্তাবের কথাটা আবার তোলেন সহকারী। এবার তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘আপা, বিয়ের প্রস্তাবটা নিয়ে খালি ফোন আসতেছে। না করি, তাও জোর করে।’

কাজ করে যে আয় হয়, তাতে আমার সহকারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন হয়েছে। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগতভাবে সঙ্গী হীনতায় ভুগছিলেন বলে আমার মনে হচ্ছিল। তাই আমি জোর দিয়ে বলি, ‘আপনি বিয়েতে রাজি হয়ে যান। ছেলেমেয়ের সঙ্গে কথা বলেন। তারা কী বলে, আমাকে জানান।’

সাত-আট দিন পর সহকারী এসে বললেন, তিনি তাঁর মেয়েকে ফোন করেছিলেন। তাঁর মেয়ে মন খারাপ করে বলেছে, ‘মা, তুমি বিয়ে করলে আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন কী বলবে!’

জানতে চাইলাম, ছেলে কী বলল! সহকারী জানালেন, ছেলেকে বলার পর সে ফোনের ওপাশে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। পরে কথা বলবে জানিয়ে ফোন কেটে দেয় সে। পরে আর ফোন করেনি।

ছেলে-মেয়ের কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া পেয়ে সহকারী দমে যান। তিনি অনেকটা মনমরা হয়ে বলেন, এই বয়সে তাঁর আর বিয়েটিয়ে করার ইচ্ছে নেই।

‘মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে বিজ্ঞপ্তি’ শীর্ষক প্রতিবেদনটির প্রতিবেদক সহকর্মী মানসুরা হোসাইনের সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে কথা হচ্ছিল। আমরা দুজনেই একমত হই যে, আমাদের সমাজে বিভিন্ন বিষয়ে নানা ‘ট্যাবু’ আছে। এ কারণেই যখন খবর হয়, মায়ের জন্য ছেলেরা পাত্র খুঁজছেন, তখন তা একটি ভিন্নধর্মী ঘটনা হিসেবে সমাজে আলোচিত হয়।

আমার বড় খালার বিয়ে হয়েছিল গত শতকের চল্লিশের দশকে। তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে ছয় মাস বয়সী ছেলে নিয়ে বিধবা হন।

আম্মাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘খালাম্মা কেন আর বিয়ে করেনি?’

আম্মা বললেন, ‘তোমার খালাম্মাকে কেউ কখনো জিজ্ঞেসও করেনি যে, তিনি বিয়ে করতে চান কি না।’

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হিন্দু বিধবা বিয়ে নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। এ জন্য তাঁকে অনেক কটূক্তি-বিদ্রূপ সহ্য করতে হয়েছিল। তাঁকে বিদ্রূপ করে এক পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, ‘…সাজ গো বিধবাগণ ফুটিয়াছে ফুল/তোমাদের সৌভাগ্য ঈশ্বর অনুকূল।’ বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়।

আমাদের সমাজ-সভ্যতা অনেক দূর এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তারপরও আমরা কোথায় যেন এখনো পিছিয়ে আছি।

স্বামী বা স্ত্রী মারা গেলে বা বিয়েবিচ্ছেদের পর কেউ একাজীবন বেছে নিলে, তাঁকে সমাজ সাধুবাদ জানায়। একাই সন্তানকে বড় করতে থাকা ব্যক্তির জন্য প্রশংসাবাক্য ঝরতে থাকে। সন্তানেরাও বাবা বা মায়ের জন্য গর্ববোধ করতে থাকেন। অন্যদিকে, যাঁরা একা হয়ে যান, একজন সঙ্গী চান, তাঁরা সমাজের কথা ভেবে বিয়েতে নিরুৎসাহী হয়ে পড়েন।

সমাজের প্রচলিত এই ভাবনার বাইরে যেতে পেরেছেন ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা মোহাম্মদ অপূর্ব ও তাঁর বড় ভাই মোহাম্মদ ইমরান হোসেন। বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁরা মা ডলি আক্তারের (৪২) একাকিত্বের কথা অনুধাবন করতে পেরেছেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন, তাঁদের মায়ের একজন ভালো জীবনসঙ্গী দরকার। মা-ও রাজি হয়েছেন। তাই মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন তাঁরা।

মাকে ভালো রাখার জন্য অপূর্বদের এই উদ্যোগ, সমাজের জন্য একটা দারুণ দৃষ্টান্ত। তাঁরা সত্যিই সমাজকে নাড়া দিতে পেরেছেন। যার জন্য এই খবরটি সাড়া ফেলেছে। তাঁদের অভিবাদন। এভাবেই সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে বদল আসুক।

নাজনীন আখতার: জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, প্রথম আলো

[ad_2]

Source link

Leave a Comment