লেখক আকবর আলি খানের জায়গা-জমিন

[ad_1]

কিছুদিন আগে একটি পত্রিকা আকবর আলি খানকে সংবর্ধনা দেওয়ার অংশ হিসেবে একটি তথ্যচিত্র বানানোর উদ্যোাগ নেয় এবং সে জন্য আমার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। এতে অনেক কথার মধ্যে আমি বলেছিলাম যে আজ থেকে শতবর্ষ পরে যখন এ দেশের মানুষজন, বিদ্বৎসমাজ, সুশীল সমাজ বা আমলাতন্ত্র আকবর আলি খানকে স্মরণ করবে, তখন তারা তাঁর বইগুলোর কথাই স্মরণ করবে। তিনি যে সর্বোচ্চ পদাধিকারী বড় আমলা ছিলেন, অর্থনীতির অনেক ব্যবহারিক উন্নয়ন সাধনে কাজ করেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন, বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক ছিলেন অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছিলেন—এসব কথা কেউ হয়তো ততটা মনে আনবে না। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর ভূমিকা (তাঁর আত্মজীবনী পুরানো সেই দিনের কথায় কিছুটা প্রকাশিত) এবং তাঁর লেখাজোখার জন্যই তাঁকে স্মরণ করবে।

আমার এই কথাগুলো বলার পেছনে যৌক্তিক কিছু কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, আমার মনে হয়েছিল, আকবর আলি খান আমাদের বাংলাদেশে (মূলত পূর্ব বাংলায়) ধর্মান্তরকরণ সম্পর্কে নতুন একটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন। আর বাংলাদেশের জাতিরাষ্ট্র গঠনে এটি যে একটি মূল উপাদান হিসেবে কাজ করেছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কিন্তু ধর্মান্তরকরণ এই এলাকাতেই কেন এত বেশি ঘটেছিল? এর যৌক্তিক, ভূপ্রকৃতিগত, আবহাওয়াগত কারণ (পানির প্রতুলতা), সামাজিক কারণ (অসংঘবদ্ধ গ্রামীণ সমাজ), প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতাপ্রিয়তা (সীমান্ত তত্ত্ব), ইত্যাদির মাধ্যমে যে বিশ্লেষণ তিনি তুলে ধরেছেন, এর জন্য ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের যে ১০০ বছর পরও তাঁকে আবশ্যিকভাবে বিবেচনায় নিতে হবে, তা বারবারই আমার মনে হয়। তিনি কেবল ডিসকভারি অব বাংলাদেশ বইয়েই এ কথা বলেননি, আরও অনেক রচনাতেও বিষয়গুলো উপস্থাপন করেছেন। যেমন বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ, বাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রসার: ঐতিহাসিক প্রশ্নসমূহের পুনর্বিবেচনা প্রভৃতি। বিদ্যমান কিছু সামাজিক-ঐতিহাসিক তত্ত্ব—যথা রিচার্ড ইটন, অসীম রায়ের তত্ত্বসহ প্রচলিত অন্যান্য তত্ত্ব—ইসলাম ধর্ম প্রচারে মুসলিম শাসকদের আনুকূল্য, ব্রাহ্মণ্যবাদের উৎপীড়ন হেতু নিম্নবর্ণের বিদ্রোহ, হিন্দু উৎপীড়নের ফলে উৎপীড়িত বৌদ্ধদের ইসলাম গ্রহণ, ধর্ম প্রচারে পীরদের অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ ইত্যাকার প্রস্তাবকে আংশিক সত্য অথবা ঐতিহাসিকভাবে বা সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে যুক্তিযুক্ত নয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। আবার বাংলায় মুসলমানদের ধর্মান্তরকরণ সম্পর্কে যা বলেছেন, তা হলো ‘বাংলার ইসলাম প্রচারে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে পূর্ব বাংলার উন্মুক্ত গ্রামের সংখ্যাধিক্য। উন্মুক্ত গ্রামে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তাই এখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ছিল প্রবল। এখানে কেউ পীরদের সম্মোহনী শক্তিতে ও মাজেজায় অভিভূত হলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে দ্বিধা করেনি। কিন্তু যারা নিয়ন্ত্রিত সমাজে বাস করত, তাদের পক্ষে জাতিচ্যুতি ও একঘরে হওয়ার ভয়ে ইসলাম গ্রহণ সম্ভব ছিল না।’ আকবর আলি খান আরও লিখেছেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বাংলাদেশের মানুষের জন্য একই সঙ্গে ছিল আশীর্বাদ ও অভিশাপ। আশীর্বাদ কারণ, তারা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ধর্ম বেছে নিতে পেরেছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাব রাজনীতিতে দুর্বলতার সৃষ্টি করেছে।

[ad_2]

Source link

Leave a Comment